তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র কী? সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ শক্তি, তাপ এবং কাজের মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক এবং প্রসারণশীল গ্যাসের কৃত কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এই ব্লগে।
তাপ মূলত শক্তির একটি রূপ। কোনো জ্বালানি পোড়ালে তাপ উৎপন্ন হয় এবং কোনো উত্তপ্ত বস্তুকে ঠান্ডা করলে তা তার তাপ পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। তবে সব শক্তিকে সহজে তাপে বা তাপকে সহজে অন্য শক্তিতে রূপান্তর করা যায় না। তাই বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, কতটুকু তাপকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
প্রকৃতিতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু এসব পরিবর্তন এলোমেলোভাবে ঘটে না। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা কারণ থাকে। যেমন— পাহাড়ের ওপর থেকে পাথর নিচে পড়ে, কিন্তু নিজে থেকে উপরে উঠে না।
বিজ্ঞানী জেমস প্রেসকট জুল পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, তাপ ও কাজের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ককে সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, যা তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র নামে পরিচিত।
সূত্র
যান্ত্রিক শক্তি দ্বারা যে কাজ করা হয়, তা তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে এবং তাপ শক্তি থেকেও যান্ত্রিক কাজ উৎপন্ন হতে পারে।
$W \propto H$
$W = JH$
- $W$ = কাজের পরিমাণ
- $H$ = তাপের পরিমাণ
- $J$ = জুল ধ্রুবক
সিস্টেম (System)
পরীক্ষা বা বিশ্লেষণের সুবিধার্থে আমরা মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট অংশকে আলাদা করে বিবেচনা করি। এই নির্দিষ্ট অংশকে সিস্টেম বলা হয় এবং এর বাইরে যা কিছু থাকে তাকে পরিবেশ বলা হয়।
তাপগতিবিদ্যায় কোনো সিস্টেমের অবস্থা বর্ণনা করতে চাপ ($P$), আয়তন ($V$) এবং তাপমাত্রা ($T$) ব্যবহার করা হয়। এই রাশিগুলোর পরিবর্তনের মাধ্যমে সিস্টেমের অবস্থার পরিবর্তন বোঝানো হয়, যাকে তাপগতীয় প্রক্রিয়া বলা হয়।
সিস্টেমের প্রকারভেদ
উন্মুক্ত সিস্টেম (Open System)
যে সিস্টেম পরিবেশের সাথে ভর ও শক্তি উভয়ই আদান-প্রদান করতে পারে।
বন্ধ সিস্টেম (Closed System)
যে সিস্টেম শক্তি আদান-প্রদান করতে পারে, কিন্তু ভর আদান-প্রদান করতে পারে না।
বিচ্ছিন্ন সিস্টেম (Isolated System)
যে সিস্টেম পরিবেশের সাথে না ভর, না শক্তি— কোনো কিছুই আদান-প্রদান করে না।
অভ্যন্তরীণ শক্তি (Internal Energy)
আমাদের চারপাশের প্রতিটি বস্তুতেই শক্তি সঞ্চিত থাকে। কোনো বস্তুর ভেতরে যে মোট শক্তি সঞ্চিত থাকে, তাকে তার অভ্যন্তরীণ শক্তি বলা হয়।
তাপ নিজে কোনো পদার্থ নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শক্তির আদান-প্রদান ঘটে। প্রকৃতিতে শক্তি বিভিন্ন রূপে থাকে— যেমন যান্ত্রিক শক্তি, তাপ শক্তি, রাসায়নিক শক্তি ইত্যাদি।
কোনো বস্তু উত্তপ্ত হলে তার অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং ঠান্ডা হলে তা হ্রাস পায়।
একটি বস্তুর অণু-পরমাণুর গতিশক্তি, বিভব শক্তি, কম্পন ও ঘূর্ণনগত শক্তির সমষ্টিই তার অভ্যন্তরীণ শক্তি। এই শক্তি বস্তুকে কাজ করার সামর্থ্য দেয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এটি এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হতে পারে।
অতএব, কোনো বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিবর্তনই মূলত তার তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।
তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র: তাপ, অভ্যন্তরীণ শক্তি ও কাজের সম্পর্ক
তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র মূলত শক্তির নিত্যতার নীতির একটি বিশেষ রূপ। এই সূত্র অনুযায়ী, কোনো সিস্টেমে তাপশক্তি অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হলে বা অন্য কোনো শক্তি তাপে রূপান্তরিত হলে, মোট শক্তির পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকে।
সূত্রের ব্যাখ্যা
যখন কোনো সিস্টেমে তাপ সরবরাহ করা হয়, তখন সেই তাপের একটি অংশ সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয় এবং অবশিষ্ট অংশ দ্বারা সিস্টেম তার পরিবেশের উপর কাজ সম্পাদন করে।
ধরা যাক, সিস্টেমে সরবরাহকৃত তাপ = $\Delta Q$
অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিবর্তন = $\Delta U$
সম্পাদিত কাজ = $\Delta W$
$\Delta Q = \Delta U + \Delta W$
অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তনের ক্ষেত্রে:
$dQ = dU + dW$
চিহ্নের ব্যাখ্যা
- $\Delta Q$ বা $dQ$ ধনাত্মক হলে সিস্টেমে তাপ সরবরাহ করা হয়েছে
- $\Delta U$ বা $dU$ ধনাত্মক হলে অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে
- $\Delta W$ বা $dW$ ধনাত্মক হলে সিস্টেম পরিবেশের উপর কাজ করেছে
- ঋণাত্মক চিহ্ন বিপরীত অর্থ নির্দেশ করে
বিকল্প রূপ
$dU = dQ - dW$
অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিবর্তন হলো সরবরাহকৃত তাপ থেকে সম্পাদিত কাজ বিয়োগের সমান।
প্রথম সূত্রের ব্যবহার: প্রসারণশীল গ্যাসের কাজ
(ক) সমচাপ প্রক্রিয়া (Isobaric Process)
যে প্রক্রিয়ায় গ্যাসের চাপ স্থির থাকে, তাকে সমচাপ প্রক্রিয়া বলা হয়।
ধরা যাক, একটি সিলিন্ডারে পিস্টনের সাহায্যে গ্যাস আবদ্ধ আছে। গ্যাসের চাপ $p$ এবং পিস্টনের ক্ষেত্রফল $A$। গ্যাস প্রসারিত হয়ে পিস্টনকে $dx$ দূরত্ব সরায়।
কাজ $dW = F \times dx = pA \times dx$
যেহেতু $A \times dx = dV$, তাই
$dW = p \times dV$
মোট কাজ
যদি গ্যাসের আয়তন $V_1$ থেকে $V_2$ তে পরিবর্তিত হয়, তাহলে মোট কাজ:
$W = p(V_2 - V_1)$
নির্দেশক চিত্র (Indicator Diagram)
চাপ-আয়তন ($p-V$) গ্রাফের সাহায্যে গ্যাসের কাজ নির্ণয় করা যায়। এই গ্রাফে বক্ররেখার নিচের ক্ষেত্রফলই সম্পাদিত কাজ নির্দেশ করে।
(খ) সমোষ্ণ প্রক্রিয়া (Isothermal Process)
যে প্রক্রিয়ায় কোনো সিস্টেমের তাপমাত্রা স্থির রেখে তাকে প্রসারিত বা সংকুচিত করা হয় তাকে সমতাপীয় প্রক্রিয়া বলে। তাপগতিবিদ্যার ভাষায় সিস্টেমের তাপমাত্রা স্থির থাকলে তাকে সমতাপীয় প্রক্রিয়া বলা হয়।
ধরা যাক, একটি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার একটি পিস্টন দ্বারা আবদ্ধ। সিলিন্ডারের চারপাশে তাপ পরিবাহী পদার্থ রয়েছে। ধীরে ধীরে পিস্টন সরালে গ্যাস প্রসারিত হয়।
যদি সিস্টেমে খুব ধীরে তাপ সরবরাহ করা হয় তাহলে তাপমাত্রা স্থির থাকে এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির কোনো পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ,
$\Delta U = 0$
তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র অনুযায়ী,
$dQ = dW$
অতএব, সমতাপীয় প্রক্রিয়ায় সিস্টেমে সরবরাহকৃত তাপ সম্পূর্ণ কাজ সম্পাদনে ব্যবহৃত হয়।
সমতাপীয় প্রক্রিয়ার জন্য বয়েলের সূত্র প্রযোজ্য:
$P_1V_1 = P_2V_2$
(গ) রুদ্ধতাপীয় প্রক্রিয়া (Adiabatic Process)
যে প্রক্রিয়ায় সিস্টেম থেকে তাপ বাইরে যায় না বা বাইরে থেকে কোনো তাপ সিস্টেমে আসে না তাকে রুদ্ধতাপীয় প্রক্রিয়া বলে। সিস্টেমটিকে পরিবেশ থেকে তাপীয়ভাবে অন্তরিত করে অথবা গ্যাসকে দ্রুত প্রসারিত অথবা সংকুচিত করলে রুদ্ধতাপীয় প্রক্রিয়া পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় সিস্টেমের যে পরিবর্তন হয় তাকে রুদ্ধতাপীয় পরিবর্তন বলে। এর ফলে গ্যাসের যে প্রসারণ হয় তাকে রুদ্ধতাপীয় প্রসারণ, আর গ্যাস সংকুচিত হলে তাকে রুদ্ধতাপীয় সংকোচন বলে।
যেহেতু রুদ্ধতাপীয় প্রক্রিয়ায় সিস্টেমে কোনো তাপ প্রবেশ করতে পারে না বা সিস্টেম থেকে কোনো তাপ বেরিয়ে যেতে পারে না সুতরাং $dQ = 0$। অতএব, তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র থেকে আমরা পাই,
$$0 = dU + dW$$ $$\therefore dW = -dU \quad \dots \quad (1)$$
রুদ্ধতাপীয় প্রসারণের সময় সিস্টেম কর্তৃক সম্পাদিত কাজ সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ শক্তি দ্বারা সম্পাদিত হয় বলে সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ শক্তি তথা তাপমাত্রা হ্রাস পায় অর্থাৎ সিস্টেম শীতল হয়। পক্ষান্তরে রুদ্ধতাপীয় সংকোচনের সময় বাইরে থেকে শক্তি সরবরাহ করে সিস্টেমের ওপর কাজ সম্পাদিত হয় বলে সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি পায় ফলে সিস্টেমের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং রুদ্ধতাপীয় প্রসারণে সিস্টেম শীতল হয় আর রুদ্ধতাপীয় সংকোচনে সিস্টেম উষ্ণ হয়।
গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ বা মোলার তাপীয় ক্ষমতা
মোলার আপেক্ষিক তাপের সংজ্ঞা: কোনো পদার্থের এক মোলের উষ্ণতা এক কেলভিন বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় তাপকে ঐ পদার্থের মোলার আপেক্ষিক তাপ বা মোলার তাপীয় ক্ষমতা বলে।
কোনো পদার্থের $m$ মোলের তাপমাত্রা $\Delta T$ কেলভিন বৃদ্ধি করতে যদি $\Delta Q$ জুল তাপশক্তির প্রয়োজন হয় তাহলে ঐ পদার্থের মোলার আপেক্ষিক তাপ,
$$C = \frac{\Delta Q}{m \Delta T}$$
একক: মোলার আপেক্ষিক তাপের একক : $J (mol)^{-1} K^{-1}$
তাপমাত্রার পরিবর্তনের জন্য পদার্থের চাপ এবং আয়তনের পরিবর্তন ঘটে। কঠিন ও তরল পদার্থের জন্য এই পরিবর্তন নগণ্য হওয়ায় তা উপেক্ষা করা যায়। গ্যাসের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার পরিবর্তনের জন্য চাপ ও আয়তনের পরিবর্তন অনেক বেশি হওয়ায় জন্য গ্যাসের আপেক্ষিক তাপের সংজ্ঞা দেয়ার সময় চাপ ও আয়তনের শর্ত নির্দিষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। দুটি ক্ষেত্রের প্রতি আমরা বিশেষভাবে আগ্রহী: (i) যখন চাপ স্থির থাকে এবং (ii) যখন আয়তন স্থির থাকে।
১. স্থির চাপে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ, $C_p$:
চাপ স্থির রেখে এক মোল গ্যাসের তাপমাত্রা এক কেলভিন বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় তাপশক্তিকে স্থির চাপে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ, $C_p$ বলে।
চাপ স্থির রেখে $m$ মোল গ্যাসের তাপমাত্রা $\Delta T$ কেলভিন বৃদ্ধি করতে যদি $\Delta Q$ জুল তাপশক্তির প্রয়োজন হয় তাহলে স্থির চাপে ঐ গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ,
$$C_p = \frac{\Delta Q}{m \Delta T}$$
২. স্থির আয়তনে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ, $C_v$:
আয়তন স্থির রেখে কোনো গ্যাসের এক মোলের তাপমাত্রা এক কেলভিন বাড়াতে প্রয়োজনীয় তাপশক্তিকে স্থির আয়তনে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ, $C_v$ বলে।
আয়তন স্থির রেখে $m$ মোল গ্যাসের তাপমাত্রা $\Delta T$ কেলভিন বৃদ্ধি করতে যদি $\Delta Q$ জুল তাপশক্তির প্রয়োজন হয় তাহলে স্থির আয়তনে ঐ গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ,
$$C_v = \frac{\Delta Q}{m \Delta T}$$
একটি আদর্শ গ্যাসের জন্য $C_p$ এবং $C_v$ এর মধ্যে সম্পর্ক
Relation Between $C_p$ & $C_v$ for an Ideal Gas
ধরা যাক, ঘর্ষণহীন পিস্টন লাগানো একটি সিলিন্ডারের মধ্যে এক মোল গ্যাস আছে। এই গ্যাসের চাপ $p$, আয়তন $V$, তাপমাত্রা $T$ এবং অভ্যন্তরীণ শক্তি $U$। এখন এই গ্যাসে চাপ স্থির রেখে $dQ$ পরিমাণ তাপশক্তি সরবরাহ করায় এর অভ্যন্তরীণ শক্তি, আয়তন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেল যথাক্রমে $dU$, $dV$ এবং $dT$। তাপ প্রয়োগে বাহ্যিক কাজের পরিমাণ $dW$ হলে তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র থেকে আমরা পাই,
$dQ = dU + dW$
বা, $dQ = dU + p dV$ .................. (1)
কিন্তু আমরা জানি, 1 মোল গ্যাসের অভ্যন্তরীণ শক্তির বৃদ্ধি $dU$ হচ্ছে স্থির আয়তনে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ $C_v$ এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি $dT$ এর গুণফলের সমান, অর্থাৎ
$dU = C_v dT$ .................. (2)
$dU$ এর মান (1) সমীকরণে বসালে $dQ = C_v dT + p dV$ .................. (3)
আবার আমরা জানি, চাপ স্থির রেখে 1 মোল গ্যাসের তাপমাত্রা 1 K বৃদ্ধি করতে
প্রয়োজনীয় তাপই স্থির চাপে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ অর্থাৎ
$C_p = \frac{dQ}{dT}$
বা, $dQ = C_p dT$ .................. (4)
$dQ$ এর মান (3) সমীকরণে বসিয়ে আমরা পাই, $C_p dT = C_v dT + p dV$
.................. (5)
আবার, মোলার গ্যাস ধ্রুবক $R$ হলে, 1 মোল গ্যাসের জন্য আমরা জানি,
$pV = RT$
একে $T$ এর সাপেক্ষে অন্তরীকরণ করে
$\frac{d}{dT}(pV) = \frac{d}{dT}(RT)$
বা, $p \frac{dV}{dT} = R$ [$\because$ $p$ স্থির]
বা, $p dV = R dT$ .................. (6)
$p dV$ এর মান (5) সমীকরণে বসিয়ে আমরা পাই,
$C_p dT = C_v dT + R dT$
বা, $C_p = C_v + R$
$\therefore C_p - C_v = R$ .................. (7)
যেহেতু সর্বজনীন বা মোলার গ্যাস ধ্রুবক $R$ সর্বদা একটি ধনাত্মক রাশি, সুতরাং
$C_p > C_v$।
$\therefore C_p$ সর্বদাই $C_v$ এর চেয়ে বড়।
তাপগতিবিদ্যায় স্থির চাপে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ $C_p$ এবং স্থির আয়তনে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ $C_v$ এর অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাশি। এই অনুপাতকে $\gamma$ দ্বারা সূচিত করা হয়; অর্থাৎ
$\gamma = \frac{C_p}{C_v}$ .................. (8)
গ্যাসের গতিতত্ত্বের সাহায্যে এক পারমাণবিক গ্যাসের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় $C_v =
\frac{3}{2}R$
$\therefore C_p = C_v + R = \frac{3}{2}R + R = \frac{5}{2}R$
$\therefore$ এক পারমাণবিক গ্যাসের জন্য, $\gamma = \frac{C_p}{C_v} =
\frac{\frac{5}{2}R}{\frac{3}{2}R} = \frac{5}{3} = 1.67$
দ্বিপারমাণবিক গ্যাসের জন্য, $\gamma = \frac{C_p}{C_v} = \frac{7}{5} = 1.40$
বহুপারমাণবিক গ্যাসের জন্য, $\gamma = \frac{C_p}{C_v} = \frac{4}{3} = 1.33$
$\gamma$ এর গুরুত্ব:
- $\gamma$ এর মান থেকে গ্যাসের আণবিক বিন্যাস সম্পর্কে জানা যায়। যেমন: $\gamma = 1.4$ হলে গ্যাসটি দ্বিপারমাণবিক।
- গ্যাসে শব্দের বেগের মান $\gamma$ এর ওপর নির্ভর করে। যেমন: $v = \sqrt{\frac{\gamma p}{\rho}}$
- রুদ্ধতাপীয় পরিবর্তনের সময় গ্যাসের চাপ ও আয়তনের সম্পর্ক $\gamma$ এর ওপর নির্ভর করে। যেমন: $pV^{\gamma}$ = ধ্রুবক
রুদ্ধতাপীয় পরিবর্তনের সময় আদর্শ গ্যাসের ক্ষেত্রে \( pV^\gamma\) = ধ্রুবক
In case of Adiabatic Change for an Ideal Gas \( pV^\gamma = \text{Constant} \)
ধরা যাক, ঘর্ষণহীন পিস্টন লাগানো একটি সিলিন্ডারের মধ্যে এক মোল গ্যাস আছে (উপরের চিত্রমতে)। এই গ্যাসের চাপ \( p \), আয়তন \( V \), তাপমাত্রা \( T \) এবং অভ্যন্তরীণ শক্তি \( U \)। এখন এই গ্যাসে \( dQ \) পরিমাণ তাপশক্তি সরবরাহ করায় এর চাপ, আয়তন, তাপমাত্রা এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিবর্তন হলো যথাক্রমে \( dp \), \( dV \), \( dT \) এবং \( dU \)। তাপ প্রয়োগে বাহ্যিক কাজের পরিমাণ \( dW \) হলে তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র থেকে আমরা জানি,
\[ dQ = dU + dW \] বা, \( dQ = dU + pdV \)
কিন্তু আমরা জানি, ১ মোল গ্যাসের অভ্যন্তরীণ শক্তির বৃদ্ধি \( dU \) হচ্ছে স্থির আয়তনে গ্যাসের মোলার আপেক্ষিক তাপ \( C_v \) এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি \( dT \) এর গুণফলের সমান,
অর্থাৎ \( dU = C_v dT \)
\[ \therefore dQ = C_v dT + pdV \]
এখন রুদ্ধতাপীয় প্রক্রিয়ায়, \( dQ = 0 \)
\( C_v dT + pdV = 0 \) ---------- {1}
আবার, ১ মোল আদর্শ গ্যাসের ক্ষেত্রে আমরা জানি,
\(pV = RT \)
এই সমীকরণকে T এর সাপেক্ষে অন্তরীকরণ করে আমরা পাই,
\( \frac{d}{dT} (pV) = \frac{d}{dT} (RT) \)
বা, \( p \frac{dV}{dT} + V \frac{dp}{dT} = R \)
বা, \( pdV + Vdp = RdT \)
\( \therefore dT = \frac{pdV + Vdp}{R} \)
\(dT\) এর এই মান (1) সমীকরণে বসিয়ে
\( C_v \times \frac{pdV + Vdp}{R} + pdV = 0 \)
বা, \(C_v pdV + C_v Vdp + R pdV = 0 \)
বা, \( C_v pdV + C_v Vdp + (C_p - C_v) pdV = 0 \)
\( [\because R = C_p - C_v] \)
বা, \( C_v pdV + C_v Vdp + C_p pdV - C_v pdV = 0 \)
বা, \( C_v Vdp + C_p pdV = 0 \)
বা, \( Vdp + \frac{C_p}{C_v} pdV = 0 \)
বা, \( Vdp + \gamma pdV = 0 \)
\([ \because \gamma = \frac{C_p}{C_v} ] \)
উভয়পক্ষকে \(pV \) দ্বারা ভাগ করে,
বা, \( \frac{dp}{p} + \gamma \frac{dV}{V} = 0 \)
একে সমাকলন করে
\( \ln p + \gamma \ln V \)= ধ্রুবক
বা, \( \ln p + \ln V^\gamma \) = ধ্রুবক
বা, \( \ln (pV^\gamma) \) = ধ্রুবক
\( \therefore pV^\gamma \)= ধ্রুবক ...... .....{2}
রুদ্ধতাপীয় রেখা সমোষ্ণ রেখার চেয়ে অধিকতর খাড়া (Adiabat is more Steeper than Isotherm)
একটি রেখা কত খাড়া সেটি বোঝা যায় রেখাটির ঢাল তথা অনুভূমিক অক্ষের সাথে উৎপন্ন কোণ দ্বারা। যে রেখা যত বেশি খাড়া তার ঢাল তত বেশি। $pV$ লেখচিত্রের কোনো বিন্দুতে ঢাল পরিমাপ করা হয় ঐ বিন্দুতে অঙ্কিত স্পর্শক $V$ অক্ষের সাথে যে কোণ উৎপন্ন করে তার ট্যানজেন্ট অর্থাৎ $\frac{dp}{dV}$ দ্বারা।
সমোষ্ণ রেখার ঢাল : সমোষ্ণ রেখার পরিবর্তনের সময় আমরা জানি,
$pV$ = ধ্রুবক।
একে $V$ এর সাপেক্ষে অন্তরীকরণ করে আমরা পাই,
$\frac{d}{dV}(pV) = 0$
বা, $p\frac{dV}{dV} + V\frac{dp}{dV} = 0$
বা, $p + V\frac{dp}{dV} = 0$
$\therefore \frac{dp}{dV} = -\frac{p}{V}$
রুদ্ধতাপীয় রেখার ঢাল : রুদ্ধতাপীয় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে
$pV^{\gamma}$ = ধ্রুবক।
একে $V$ এর সাপেক্ষে অন্তরীকরণ করে,
$\frac{d}{dV}(pV^{\gamma}) = 0$
বা, $p\frac{d}{dV}(V^{\gamma}) + V^{\gamma}\frac{dp}{dV} = 0$
বা, $\gamma p V^{\gamma-1} + V^{\gamma}\frac{dp}{dV} = 0$
বা, $\frac{dp}{dV} = -\frac{\gamma p V^{\gamma-1}}{V^{\gamma}}$
বা, $\frac{dp}{dV} = -\gamma \frac{p}{V}$
$\therefore \frac{dp}{dV} = \gamma \left(-\frac{p}{V}\right)$
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রুদ্ধতাপীয় রেখার ঢাল $= \gamma \times$ সমোষ্ণ রেখার ঢাল
যেহেতু $\gamma$ এর মান সর্বদা $1$ এর চেয়ে বড়, সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, একই বিন্দুতে রুদ্ধতাপীয় রেখার ঢাল সমোষ্ণ রেখার ঢাল অপেক্ষা $\gamma$ গুণ বেশি। সুতরাং রুদ্ধতাপীয় রেখা সমোষ্ণ রেখার চেয়ে $\gamma$ গুণ খাড়া।
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র মূলত শক্তির নিত্যতা সূত্রের একটি বিশেষ রূপ। এটি আমাদের শেখায় যে শক্তি কখনো ধ্বংস হয় না, বরং এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়। একটি সিস্টেমে সরবরাহকৃত তাপ কীভাবে অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি করে এবং বাহ্যিক কাজ সম্পাদন করে, তার নিখুঁত গাণিতিক ব্যাখ্যা আমরা এই সূত্রের মাধ্যমে পাই। বিশেষ করে প্রসারণশীল গ্যাসের ক্ষেত্রে কৃত কাজের ধারণাটি ইঞ্জিন এবং বিভিন্ন তাপীয় যন্ত্রের কার্যপ্রণালী বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানের ছাত্র বা কৌতূহলী পাঠক হিসেবে তাপগতিবিদ্যার এই মৌলিক ভিত্তিটি বুঝতে পারা মানেই মহাবিশ্বের শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করা।




